Homeচট্টগ্রাম২৫ বছর ধরে গণ–ইফতারের আয়োজন হয়,দৈনিক অংশগ্রহণ হয় ৩ হাজারেরও বেশি লোক

২৫ বছর ধরে গণ–ইফতারের আয়োজন হয়,দৈনিক অংশগ্রহণ হয় ৩ হাজারেরও বেশি লোক

 

বিশেষ প্রতিনিধি: (চট্টগ্রাম)
চট্টগ্রামমের আন্দরকিল্লা শাহী জাবে মসজিদে দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে চলছে গণ-ইফতারের আয়োজন। সরকারি কোন সহযোগিতা ছাড়াই ভ্রাম্যমাণ লোকের সহযোগিতায় চলমান ইফতারে দৈনিক অংশগ্রহণ করেন ৩ হাজারেরও বেশী রোজাদার মুসল্লী।

হাজারো রোজাদার একসঙ্গে ইফতার করেন চট্টগ্রামের এই ঐতিহাসিক আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদে।

আসরের ওয়াক্ত শেষ হওয়ার সাথে সাথেই দেখা মিলে এই আয়োজনের দৃশ্যমান কর্মকান্ড। মসজিদে পা রাখতেই একজন সহাস্যে এগিয়ে এলেন ছোটখাটো গড়নের প্রাণচঞ্চল মানুষ। তিনি হলেন আবুল কালাম নামের একজন সেচ্ছাসেবক কথার প্রসঙ্গে তিনি জানান ১৭ বছর ধরে আবুল কালাম এই মসজিদে ইফতার আয়োজনে স্বেচ্ছাসেবকের কাজ করেন। সারা বছর তিনি যেখানেই থাকুন না কেন, পবিত্র রমজানের সময় মসজিদে হাজির হবেন। গত কয়েকবার এসে কালামকে পেয়েছি। পরিবর্তন কিছুই নেই। কেবল এবার গায়ে স্বেচ্ছাসেবকদের ইউনিফরম চড়েছে।

আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদ চট্টগ্রাম নগরের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং ঐতিহাসিক নিদর্শন। বড় খোলা চত্বর আর নকশা করা খিলানের মসজিদটি ১৬৬৭ খ্রিষ্টাব্দে মোগলদের চট্টগ্রাম বিজয়ের স্মারক হিসেবে শায়েস্তা খাঁর ছেলে বুজুর্গ উমেদ খাঁর হাতে তৈরি। দিল্লি জামে মসজিদের আদলে অনন্য স্থাপত্যে গড়া এই মসজিদ আরও একটি কারণে বিখ্যাত। আর তা হলো এখানকার গণ–ইফতার। ২৫ বছর ধরে এখানে গণ–ইফতারের আয়োজন করা হচ্ছে।

মঙ্গলবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদে গিয়ে দেখা গেল, ইফতার আয়োজনে ব্যস্ত আবুল কালামসহ অন্তত আটজন স্বেচ্ছাসেবক। বড় চত্বরের ওপরে শামিয়ানার ছাউনি। সেখানে দস্তরখানা বিছিয়ে দেওয়া হয়েছে রোজাদারদের জন্য।

মসজিদের এক পাশে বড় একটা প্লাস্টিকের গামলায় এবারও দুই হাজার মানুষের জন্য শরবত তৈরি হচ্ছে। একটি বেসরকারি কোম্পানির প্রতিনিধি মো. শহীদুল আলম নামের একজন প্রতিবছর রোজায় শরবত বানান এই মসজিদে। দূর থেকে দেখেই তিনি ডাক দিলেন। শরবত তৈরি তখন শেষ।

জানতে চাইলাম এবার কতটুকু চিনি, রুহআফজা লাগল শরবত বানাতে? শহীদ আলম বললেন, ‘আজ ২০ কেজি চিনি, ১৮ বোতল রুহআফজা, ১ কেজি লবণ, ৪০ কেজি বরফ দিয়ে শরবত তৈরি করেছি।’

ইফতার আয়োজনের সব উপকরণই মানুষের দান থেকে আসে। সরকারের কোনো সাহায্যই নেয় না এখানকার কর্তৃপক্ষ। ইফতার আয়োজনে দৈনিক কত খরচ হয় জানতে চাইলে মসজিদের খতিবের সহকারী হাসান মুরাদ বলেন, ‘এই আয়োজনে মসজিদ কর্তৃপক্ষের এক টাকাও খরচ হয় না। প্রচুর মানুষ আমাদের সাহায্য করেন। কেউ ছোলা, কেউ তৈল, বেসন বা ডাল পাঠান। সহযোগিতা করেন স্হানীয় ব্যবসায়ীরাও।

সোমবার ইফতারিতে ছিল ছোলা, পেঁয়াজু, বেগুনি, জিলাপি, চপ আর মুড়ি। বিকেল ঘনিয়ে আসতেই থালায় ইফতারি বণ্টন শুরু হয়। বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে মসজিদ প্রায় পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে। সিকিউরিটি গার্ড, ব্যাংকার, ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে রিকশাচালক—কে নেই এই গণ-ইফতার আয়োজনে।

মসজিদের মুসল্লি ও খাদেমরা জানান, রোজায় ইফতারের আয়োজন এখানকার ঐতিহ্য। তবে বড় পরিসরে গণ-ইফতারের আয়োজন করা হচ্ছে ২০০১ সাল থেকে। মসজিদের খতিব সৈয়দ মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন তাহের জাবেরী আল-মাদানীর উদ্যোগেই এ আয়োজন শুরু হয়। তাঁর ব্যক্তিগত সহকারী মো. হাসান মুরাদ এমনটাই জানালেন। এবার প্রথম রোজা থেকে মুসল্লিদের ভিড় দেখা গেছে। এর মধ্যে প্রথম দিন থেকেই তিন হাজারের বেশি মানুষ ইফতার আয়োজনে শামিল হয়েছেন। গত রোববারও সাড়ে তিন হাজারের মতো রোজাদার এসেছিলেন ইফতার করতে।

মসজিদের ইফতার আয়োজনে সব শ্রেণির মানুষ অংশ নেন। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারী, শ্রমিক, রিকশাচালক, শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে অসহায় দুস্থ লোকজন এখানে আসেন। ইফতারির থালা ঘিরে তৈরি হয় এক অন্যরকম সমতা।

কয়েক বছর ধরে রোজার মাসের পুরোটা সময় মসজিদে সময় দেন জয়নাল আবেদিন। প্লেটে ইফতারি দিচ্ছিলেন তিনি। এর ফাঁকেই কথা হয় তাঁর সঙ্গে। জয়নাল পেশায় দিনমজুর। রোজার সময় মসজিদে রোজাদারদের ‘খিদমতে’ লেগে যান। রোজায় মসজিদে সময় দেন তিনি বিনা পারিশ্রমিকে।

জানতে চাইলাম, রোজগার কম হওয়ায় সংসারে টান পড়ছে কি না। তিনি দুপাশে মাথা নাড়লেন। বললেন, ‘এখানে তো কামাই করতে আসি না। রোজাদারেরা তৃপ্তি করে খান—এটাই সবচেয়ে বড় পাওয়া।’

চট্টগ্রামের আছদগঞ্জের বাসিন্দা ষাটোর্ধ্ব শামসুল আলম নামের এক বৃদ্ধ বসেছিলেন মসজিদের ভেতরের অংশে। ইফতার করতে এখানে আসার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘প্রতি রোজায় একবার এখানে আসি। সবার সঙ্গে ইফতার করার আনন্দই আলাদা। শত শত রোজাদার আল্লাহর দরবারে হাত তুলেছেন। কারও উসিলায় হয়তো আমার রোজাও কবুল হবে।

এভাবেই চলে আসছে দীর্গ ২৫ বছর ধরে এই বৃহৎ গণ-ইফতারের আয়োজন। তবে সব চেয়ে অভাক করা বিষয় হলো নেই কোন সরকারি অনুদান, খরচ হয়না মসজিদ পরিচালনা কমিটিরও কোন অর্থ। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ভ্রাম্যমাণ ও স্হানীয় ব্যবসায়ীদের সহযোগিতায় অব্যহত রয়েছেন এই বৃহৎ গণ-ইফতারের আয়োজন।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments