নিজস্ব প্রতিবেদক: (চট্টগ্রাম)
লাখ টাকায় স্বল্প সময়ের মধ্যে প্রদান করা হতো নকল পুলিশ ক্লিয়ারেন্স! এমনই এক চক্রের চার সদস্যকে গ্রেফতার করে চক্রটির রহস্য উন্মোচন করলেন চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ।
পুলিশের দাবি
বিদেশগামী নাগরিকদের পুলিশ ক্লিয়ারেন্স প্রদানের নামে প্রতারণা, সরকারি কর্মকর্তাদের স্বাক্ষর জালিয়াতি, সরকারি নথির আদলে জাল সনদ তৈরি এবং নকল ওয়েবসাইট ও QR কোড ব্যবহার করে প্রতারণার মাধ্যমে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার অপতৎপরতা চালাতো চক্রটি।
নকল ওয়েবসাইট ও QR কোডে জালিয়াতি
বিদেশগামী এক ব্যক্তির পুলিশ ক্লিয়ারেন্স প্রয়োজনের বিষয়কে কেন্দ্র করে চক্রটির কার্যক্রমের সূত্রপাত। সহজে ও স্বল্প সময়ে পুলিশ ক্লিয়ারেন্স করে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে চক্রের সদস্যরা তার কাছ থেকে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা দাবি ও গ্রহণ করে।
পরবর্তীতে চক্রটি সরকারি কর্মকর্তাদের স্বাক্ষর জাল করে প্রকৃত পুলিশ ক্লিয়ারেন্সের আদলে একটি জাল সনদ তৈরি করে। প্রতারণাকে বিশ্বাসযোগ্য করতে তারা প্রকৃত পুলিশ ক্লিয়ারেন্সের QR কোডের আদলে নকল QR কোড ও একটি নকল ওয়েবসাইট তৈরি করে। QR কোড স্ক্যান করে যাচাই করা হলে প্রকৃত সরকারি ওয়েবসাইটের পরিবর্তে চক্রটির তৈরি নকল ওয়েবসাইটে তথ্য প্রদর্শিত হতো।
চক্রটির তৈরি জাল ক্লিয়ারেন্সটি ভুক্তভোগী প্রকৃত মনে করে সংশ্লিষ্ট ট্রাভেল এজেন্সিতে জমা দেন। পরবর্তীতে ট্রাভেল এজেন্সির যাচাইয়ে সেটি জাল হিসেবে শনাক্ত হলে তিনি বিষয়টি পুলিশ সুপার, চট্টগ্রাম বরাবর লিখিতভাবে জানান।
জালিয়াতির রহস্য উদঘাটন ও গ্রেফতার
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ট্রাফিক এন্ড মিডিয়া) মো. রাসেল জানায়,অভিযোগ পাওয়ার পর পুলিশ সুপার চট্টগ্রাম এর নির্দেশনায় জেলা গোয়েন্দা শাখা বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্তে নামে। দক্ষতা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে তথ্য যাচাইয় করা হয়, এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ, পারস্পরিক যোগাযোগ, অর্থ লেনদেন এবং ব্যবহৃত প্রযুক্তিগত তথ্য বিশ্লেষণসহ বিভিন্ন তথ্য-উপাত্তের সমন্বিত অনুসন্ধান চালানো হয়।
তদন্তের ধারাবাহিকতায় অল্প সময়ের মধ্যেই চক্রটির সদস্যদের শনাক্ত করা সম্ভব হয়। পরবর্তীতে সোমবার (১৭ আগস্ট) রাতে চট্টগ্রাম বাশঁখালী ও চট্টগ্রাম মহানগরীর বিভিন্ন এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে জাল পুলিশ ক্লিয়ারেন্স প্রস্তুত, নকল ওয়েবসাইট ও QR কোড তৈরির মাধ্যমে প্রতারণা এবং অর্থ লেনদেনের সঙ্গে জড়িত ৪ সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
ভুক্তভোগীর অভিযোগের প্রেক্ষিতে বাঁশখালী থানায় নিয়মিত মামলা রুজু করা হয়েছে। প্রতারক চক্রটির সঙ্গে আরও অনেকে জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। তাদের শনাক্ত ও গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
গ্রেফতারকৃতরা হলেন,১। মো.আশরাফ আলী খান (৩৬), পিতা- আজিজ উদ্দিন, মাতা- সুলতানা বেগম, সাং- বগাবিল, খান বাড়ি, ০৩নং ওয়ার্ড, ০১নং রাজানগর ইউপি, থানা-রাঙ্গুনিয়া থানা, জেলা-চট্টগ্রাম,
<span;>২। মো. নিশান (৩৬), পিতা-মৃত জামাল, মাতা- রোকেয়া বেগম, সাং- হরিষপুর, ছামেদ আলী হাজির বাড়ি, ০৪নং ওয়ার্ড, সন্দ্বীপ পৌরসভা, থানা-সন্দ্বীপ, জেলা-চট্টগ্রাম,৩। মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন (৪৮), পিতা- মোহাম্মদ আতাউল হক তালুকদার, মাতা- শামসুন্নাহার, সাং- মধ্যম ঘাগড়া, তমিজ উদ্দিন তালুকদার বাড়ি, ০৭নং ওয়ার্ড, ০১নং রাজানগর ইউপি, থানা- রাঙ্গুনিয়া, জেলা-চট্টগ্রাম, ৪। মো. আব্দুর রহমান (৪৬), পিতা- মৃত বাদশা মিয়া, মাতা- রূপবান, সাং- দক্ষিণ জলদি, দুসারি পাড়া, ০৯নং ওয়ার্ড, বাঁশখালী পৌরসভা, থানা- বাঁশখালী, জেলা- চট্টগ্রাম।
দেশের ভাবমূর্তি রক্ষায় চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের কঠোর অবস্থান ও বার্তা
পুলিশ ক্লিয়ারেন্স একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি নথি, যা বিদেশি কর্তৃপক্ষের কাছে একজন বাংলাদেশি নাগরিকের আইনগত অবস্থার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বহন করে। সরকারি কর্মকর্তাদের স্বাক্ষর জাল করে নথি তৈরি এবং সেটিকে বিশ্বাসযোগ্য করতে নকল ওয়েবসাইট ও QR কোড ব্যবহার করা অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ।
এ ধরনের কর্মকাণ্ড শুধু নাগরিকদের সঙ্গে প্রতারণাই নয়, বরং আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের সরকারি নথির বিশ্বাসযোগ্যতা ও দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার ঝুঁকি সৃষ্টি করে।
এ’বিষয়ে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) মাসুদ আলম জানান, সরকারি নথি জালিয়াতি, প্রযুক্তির অপব্যবহার, প্রতারণা ও দালালচক্রের ৪ সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এ’সময় তিনি বলেন, দেশ ও দেশের মানুষের সাথে প্রতারণাকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা অব্যাহত থাকবে। একই সঙ্গে বিদেশগামী নাগরিকদের কোনো দালাল বা অবৈধ মধ্যস্বত্বভোগীর মাধ্যমে পুলিশ ক্লিয়ারেন্স গ্রহণ না করে নির্ধারিত সরকারি প্রক্রিয়া অনুসরণের জন্য অনুরোধ করেন তিনি।