![]()
নিজস্ব প্রতিবেদক: (চট্টগ্রাম)
চট্টগ্রাম, এক সমৃদ্ধ বাণিজ্যিক নগরী, যেখানে উন্নয়নের জয়গান ধ্বনিত হয়, সেখানেই লুকিয়ে আছে এক অন্ধকার জগৎ। এই জগৎ নিয়ন্ত্রণ করে কিছু অসাধু চক্র, যারা সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীদের জীবনকে জিম্মি করে চাঁদাবাজি ও ভয়ভীতির রাজত্ব কায়েম করতে চায়। সম্প্রতি, চট্টগ্রামের হাটহাজারী ও বায়েজিদ বোস্তামী থানা এলাকায় এমনই এক সন্ত্রাসী চক্রের দৌরাত্ম্য বেড়ে গিয়েছিল, যারা নিজেদের 'বড় সাজ্জাদ' বাহিনীর সদস্য পরিচয় দিয়ে বিদেশি নম্বর ব্যবহার করে চাঁদাবাজি ও হুমকি দিয়ে আসছিল। তবে, চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের দৃঢ় সংকল্প এবং নিরলস প্রচেষ্টায় সেই অন্ধকার জগতের শেকড় উপড়ে ফেলার এক সাহসী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত হয় হাটহাজারীর আমানবাজার এলাকার একজন চিকিৎসকের কাছে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবির মাধ্যমে। এবিষয়ে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের গণমাধ্যম শাখা জানান, চাঁদা না দিলে প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হয়, এমনকি '১০০ জন পুলিশ পাহারায় থাকলেও রক্ষা করা যাবে না' এমন ভয়ভীতি প্রদর্শন করা হয়। একই ধরনের ঘটনা ঘটে বড়দিঘীর পাড় এলাকার একজন ব্যবসায়ীর সাথেও। বিদেশি নম্বর থেকে ফোন করে তাকেও চাঁদা দাবি ও হুমকি দেওয়া হয়। এই ঘটনাগুলো চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের নজরে আসে এবং তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশ সুপার জনাব মো. মাসুদ আলম, বিপিএম মহোদয়ের নির্দেশে হাটহাজারী থানা পুলিশ তদন্ত ও গোয়েন্দা কার্যক্রম শুরু করে।
তথ্যপ্রযুক্তি বিশ্লেষণ, গোপন সূত্র এবং পূর্বে গ্রেফতারকৃত সন্ত্রাসী ডেভিড ইমন ও কালা মোবারককে জিজ্ঞাসাবাদে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে এই চক্রের সদস্যদের শনাক্ত করা হয়। তদন্তে বেরিয়ে আসে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য: চক্রটি সন্ত্রাসীদের নাম ও পরিচয়কে অপকৌশল হিসেবে ব্যবহার করে সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চাঁদা দাবি করত। নিজেদের পরিচয় গোপন রাখতে তারা বিদেশি নম্বর ও WhatsApp-এর মাধ্যমে ফোন করে ভয়ভীতি ও হুমকি দিত। প্রাথমিক তদন্তে আরও জানা যায়, ডেভিড ইমন, কালা মোবারক, বড় সাজ্জাদ ও রায়হানসহ বিভিন্ন সন্ত্রাসীর নাম ব্যবহার করলেও গ্রেফতারকৃতরা নিজেদের একটি পৃথক চাঁদাবাজ চক্র গড়ে তুলেছিল। বিভিন্ন ব্যবসায়ী ও বিত্তবান ব্যক্তির সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করে তাদের টার্গেট করা এবং পরবর্তীতে সন্ত্রাসীদের নাম ব্যবহার করে ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে চাঁদা আদায় করাই ছিল তাদের মূল কৌশল।
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার জনাব মো. মাসুদ আলম, বিপিপিএম মহোদয়ের সার্বিক দিকনির্দেশনায় এবং হাটহাজারী সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কাজী মো. তারেক আজিজের নেতৃত্বে হাটহাজারী থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মোস্তাক আহম্মেদসহ সঙ্গীয় অফিসার-ফোর্সের সমন্বয়ে একটি বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হয়। গত সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) রাত ২টা থেকে টানা ২৪ ঘণ্টা ধরে হাটহাজারী থানাধীন ভুলিয়াপাড়া ও খন্দকিয়া, বায়েজিদ বোস্তামী থানাধীন মাজার এলাকা এবং খুলশী থানাধীন দামপাড়া বাসস্ট্যান্ড এলাকায় পরিচালিত এই সাঁড়াশি অভিযানে সন্ত্রাসী চক্রটির ৭ সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়।
গ্রেফতারকৃতরা হলেন: কামরুল হাসান ওরফে সাগর (২৫), মো. রিকু (২৫), মো. তরিকুল ইসলাম ওরফে রোহিত (২০), আহমদুল্লাহ ওরফে মাসুম মেম্বর (৪০), আহমদ রেজা শাকিল (২৫), মো. মানিক (৪০) এবং নুরুল আলম (৪০)। তাদের কাছ থেকে ১টি তলোয়ার, ১টি চাপাতি, ১টি ছুরি, ১টি টিপছোরা এবং চাঁদাবাজির কাজে ব্যবহৃত বিদেশি নম্বরসহ ৪টি মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়।
গ্রেফতারকৃতদের বিরুদ্ধে পূর্বের অপরাধের দীর্ঘ তালিকাও পাওয়া গেছে। আহমদ রেজা শাকিলের বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনে ২টি, চাঁদাবাজির ২টি, অপহরণের ১টি, সন্ত্রাসবিরোধী আইনে ১টি, ডাকাতির প্রস্তুতির ১টি এবং হত্যাচেষ্টার ১টিসহ মোট ৮টি মামলা রয়েছে। মো. মানিকের বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য সংক্রান্ত ১টি এবং ডাকাতির প্রস্তুতির ১টিসহ ২টি মামলা রয়েছে। এছাড়া, কামরুল হাসান ওরফে সাগর, মো. রিকু, মো. তরিকুল ইসলাম ওরফে রোহিত এবং আহমদুল্লাহ ওরফে মাসুম মেম্বরের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির ২টি ও সন্ত্রাসবিরোধী আইনে ১টিসহ ৩টি করে মামলা রয়েছে।
গ্রেফতারকৃতদের বিরুদ্ধে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। একই সঙ্গে, চক্রটির অন্যান্য সদস্য এবং চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের তদন্ত ও অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) মো. মাসুদ আলম দৃঢ় কণ্ঠে বলেছেন, "চাঁদাবাজ সন্ত্রাসী কার্যক্রম নির্মূলে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের জিরো টলারেন্স অভিযানের মাধ্যমে ওদের শেকড়সহ নির্মূল করা হবে। চট্টগ্রামে কোনো সন্ত্রাস বাহিনী বা চাঁদাবাজ চক্র থাকবে না।" তিনি জনসাধারণের প্রতি এসব সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করার আহ্বান জানিয়েছেন। এই অভিযান কেবল কয়েকটি গ্রেফতারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটি চট্টগ্রামের শান্তিপ্রিয় মানুষের জন্য এক আশার আলো, যা সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির অন্ধকার থেকে মুক্তির পথ দেখাচ্ছে। পুলিশের এই নিরন্তর প্রচেষ্টা নিঃসন্দেহে চট্টগ্রামের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক স্থাপন করবে।
প্রধান সম্পাদক মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম
মোবাইল
০১৮১৬৮২৪৮০৭,০১৭৮০২৭৬১০৯
মেইল: news24ctg@gmail.com
অফিস
ঠিকানা কে পি প্লাজা,২য় তলা, কে
সি দে রোড, চট্টগ্রাম